গত ২৫-২৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে, এপিসকপাল যুব কমিশন খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্রের সহায়তায় আরএনডিএম রিনিউয়াল সেন্টার, মোহাম্মদপুরে চার দিনব্যাপী ৩৩ তম জাতীয় খ্রিস্টান লেখক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। উক্ত কর্মশালায় মূলভাব হিসেবে ছিল, “কলম হোক সুসমাচারের বাহক, শব্দ হোক পরিবর্তনের কারিগর”। কর্মশালায় বাংলাদেশের আটটি ধর্মপ্রদেশ এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন গঠনগৃহ ও সেমিনারী থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৪৬ জন যুবক-যুবতী ও ৩ জন ব্রতধারীসহ মোট ৪৯ জন অংশগ্রহণ করেন।
প্রার্থনার মধ্য দিয়ে লেখক কর্মশালার যাত্রা শুরু হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোর্স পরিচিতি ও নিয়মাবলী, প্রাক-প্রশিক্ষণ ধারণা ও প্রত্যাশা’ বিষয়ে সহভাগিতা করেন এপিসকপাল যুব কমিশনের অফিস সহকারী, সিস্টার চম্পা রোজারিও এমপিডিএ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এপিসকপাল যুব কমিশনের নির্বাহী সচিব ও জাতীয় যুব সমন্বয়কারী ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু সিএসসি সকল অংশগ্রহণকারীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান এবং খ্রিস্টযাগের উপদেশে ফাদার বিকাশ বলেন, আজ পবিত্র আত্মা তোমাদের মধ্যে অধিষ্ঠান করছেন, তিনিই তোমাদের কল্পনাশক্তিকে পবিত্র করে নতুন নতুন ধারণা ও উদ্দীপনা তৈরি করে “রাইটার্স ব্লক” (জড়তা কাটিয়ে) সৃজনশীল শব্দের প্রবাহে অত্যন্ত গভীর ভূমিকা রাখবেন।”
দ্বিতীয় দিনে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রার্থনা ও পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। সকালে প্রথম অধিবেশনে ওয়াইএমসিএস’র সাধারণ সম্পাদক মানিক উইলভার ডি’কস্তা “লেখালেখি সুন্দর আর্ট, নান্দনিক শিল্প, দর্শন ও গবেষণার ফসল” এর উপর বাস্তবমুখী উপস্থাপনা তুলে ধরেন। দ্বিতীয় অধিবেশনে “খ্রিস্টীয় সাহিত্য ও খ্রিস্টীয় অনুবাদ সাহিত্য: বাইবেলীয় পুস্তক লেখার ধরণ ও উদ্দেশ্য” এর উপর উপস্থাপনা করেন ফাদার প্যাট্রিক শিমন গমেজ। তিনি পবিত্র বাইবেলের বাংলা অনুবাদ ও বাইবেল কিভাবে লেখা হয়েছিলো, বঙ্গানুবাদে ও বাংলা সাহিত্যের উন্নয়নে খ্রিস্টানদের অবদান এই বিষয়ে সহভাগিতা করেন। ঐ দিনের বিকালের অধিবেশনে “খবর, রিপোর্ট, স্পট রিপোর্ট ও ফিচার লেখা, হাতে-কলমে খবর লিখন, ফিচার/রিপোর্ট/সংবাদ উপস্থাপনা ও মূল্যায়ন” এ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন চ্যানেল আই টেলিভিশনের সিনিয়র সাংবাদিক শরীফ হোসেন হৃদয়। সন্ধ্যায় পবিত্র খ্রিস্টযাগের উপদেশে সিবিসিবি সেন্টারের পরিচালক ফাদার তুষার জেমস গমেজ বলেন, “একজন খ্রিস্টান লেখক হিসাবে তোমাদের চিন্তায়-অনুভূতিতে থাকবে ঈশ্বর, হৃদয়ে থাকবে যিশু ও কন্ঠে থাকবে পবিত্র আত্মা।”
তৃতীয় দিনের সকালে এপিসকপাল যুব কমিশনের সভাপতি শ্রদ্ধেয় বিশপ সুব্রত বনিফাস গমেজ পবিত্র খ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করেন। উপদেশে তিনি বলেন, “পবিত্র আত্মাই বাইবেলের মূল্যবোধের পক্ষে আপসহীনভাবে লিখতে ও লেখক হিসাবে তোমাদের আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যাবেন, যাতে তোমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও তোমাদের লেখা একে অপরের পরিপূরক হয়।” সকালের প্রথম অধিবেশনে মূলভাবের উপর অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক সেশন পরিচালনা করেন ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু সিএসসি। তিনি বলেন, “পবিত্র আত্মা একজন স্বর্গীয় নির্দেশক হিসেবে লেখকের চিন্তাধারাকে সত্য ও সৌন্দর্যের পথে পরিচালিত করেন এবং তিনিই একজন খ্রিস্টান লেখকের কলমকে কেবল একটি যন্ত্র থেকে “জীবন্ত সাক্ষ্যে” রূপান্তরিত করতে সহায়তা করবেন।” ঐ দিনের দ্বিতীয় সেশন “বাংলা বানানের রীতি ও শব্দ উচ্চারণের কৌশল” এর উপর চমকপ্রদভাবে উপস্থাপন করেন নটর ডেম কলেজের প্রভাষক ও আবৃত্তিকার তিতাস ভিনসেন্ট রোজারিও। দুপুরে অংশগ্রহণকারীদের বাস্তাবভিক্তিক বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে মাঠ পরিদর্শনে পাঠানো হয়। তৃতীয় অধিবেশনে সন্ধ্যায় “খ্রিস্টীয় গান লেখা ও সুর করার কৌশল” সমন্ধে উপস্থাপনা ও তার সংগ্রামী জীবন সহভাগিতা করেন বিশিষ্ট গীতিকার ও সুরকার লিটন অধিকারী রিন্টু। রাতের অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীগণ মাঠ পরিদর্শনে সংগৃহিত দলীয় প্রতিবেদন ও ফিচার গুগল স্লাইডের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। অতঃপর ছবি তোলা বিষয়ে ধারণা, শর্ট ফিল্ম ও মোবাইল রিপোর্ট তৈরি করার কৌশলের উপর সংক্ষিপ্ত ধারণা দেন ফ্লেবিয়ান ডি’কস্তা।
চতুর্থ দিন অংশগ্রহণকারীদের খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্র পরিদশর্নে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে “এডিটিং, প্রুফ রিডিং, সম্পাদকীয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাণী” লেখা সম্বন্ধে সুন্দরভাবে ধারণা প্রদান করেন সাপ্তাহিক প্রতিবেশীর সম্পাদক ও সেন্টারের পরিচালক ফাদার বুলবুল আগষ্টিন রিবেরু ও তার সহকর্মীবৃন্দ। পরবর্তীতে খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্রের কার্যক্রম, কর্ম পরিধি, বিভিন্ন সেক্টর যথা: সাপ্তাহিক প্রতিবেশী, জেরি প্রিন্টিং প্রেস, প্রতিবেশী প্রকাশনী, জ্যোতি কমিউনিকেশন বাণীদীপ্তি ও রেডিও ভেরিতাস এশিয়ার কার্যক্রম পরিদর্শন করা হয়। উপরিউক্ত অধিবেশন ছাড়াও এই কর্মশালায় ছিল নিয়মিত প্রার্থনা ও খ্রিস্টযাগ, দলীয় কাজ ও সহভাগিতা ও বিভিন্ন প্রতিবেদন উপস্থাপনা। এবারের কর্মশালায় ব্যতিক্রম ছিল বিকালে বাংলাদেশ খ্রিস্টান লেখক ফোরামের আমন্ত্রিত সদস্যদের, সম্মানিত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক বিধান রিবেরু, ফাদার বুলবুল আগষ্টিন রিবেরু, মহামান্য কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও সিএসসি’র সাথে অংশগ্রহণকারীদের পরিচিতি, চেতনা ও ভাব আদান-প্রদান এবং নতুন লেখকদের লেখা দিয়ে বই ও বিশেষ পত্রিকা প্রকাশের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ। অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্নের প্রতিত্তোরে বিধান রিবেরু বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চৌর্যবৃত্তিকে ছাপিয়ে লেখকের নিজস্ব বুদ্ধিদীপ্ততাকে আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার সাথে সংযুক্ত করে সার্বজনীনভাবে সত্যগুলোকে উন্মোচিত করাই নতুন লেখক হিসাবে তোমাদের দায়িত্ব।” শেষান্তে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে ‘একজন লেখকের কী কী গুণাবলী, আদর্শ ও মূল্যবোধ থাকা আবশ্যক’ সে ব্যাপারে প্রধান অতিথিসহ সম্মানিত সকল অতিথিগণ অনুপ্রেরণামূলক কিছু কথা বলেন তাদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন।
পরিশেষে, মহামাণ্য কার্ডিনাল মহোদয় সমাপনী পবিত্র খ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করেন। প্রশিক্ষণের পর রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের আনুষকা লরেনদিয়া সেরাও ও চট্টগ্রামের ইম্মানূয়েল অনিন্দ ডায়েস তাদের নিজ নিজ অনুভূতি প্রকাশ করেন। অতঃপর ফাদার বিকাশ সবার উদ্দেশে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, “আমার বিশ্বাস, কোর্সের মাধ্যমে তোমরা একজন সৎ ও নিবেদিত লেখক হয়ে সত্যের অনুসন্ধানে নতুন দর্শনের আলোকবর্তিকা জ্বালাতে লেখনীর হাতকে আরো শাণিত ও সবল করে তুলতে পারবে।” পরিশেষে, গ্রুপ ছবি তোলার পর কার্ডিনাল মহোদয় যুবা লেখকদের আশীর্বাদ দিয়ে ৩৩তম জাতীয় খ্রিস্টান লেখক কর্মশালা ২০২৬ এর সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
সংবাদ দাতা: নিজস্ব প্রতিবেদক
