৫ জুন, নওগাঁ জেলার ধামুরহাট উপজেলার হরিতকীডাঙ্গা থেকে বেনীদুয়ার মিশনের সরু রাস্তাটি যেন হয়ে উঠেছিল দেশের অন্যতম একটি ব্যস্ত রাস্তা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, ইজিবাইক, মোটরচালিত স্থানীয় পরিবহন, মোটরসাইকেল ও পায়ে হেঁটে দলে দলে মানুষ জড়ো হচ্ছে বেনীদুয়ার মিশন প্রাঙ্গণে। উদ্দেশ্য একটাই। নবঘোষিত জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের প্রথম বিশপ অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা। 
মো: আব্দুল করিম, বেনীদুয়ার মিশন পাড়া সংলগ্ন স্থানীয় এক অধিবাসী বেনীদুয়ারে এতো মানুষের আগমনে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমার ৬৫ বছর বয়সে এ এলাকায় এতো মানুষের সমাবেশ আমি দেখিনি। অনেক দূর থেকে কতো মানুষ এসেছে। এতো মানুষ ও সাজ সাজ ভাব দেখে আমার খুব আনন্দ লাগছে। মো: আব্দুল করিমের মতো মনে হয় বেনীদুয়ার ও তৎসংলগ্ন ধর্মপল্লীগুলোতে আনন্দ-হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল এই বিশপীয় অভিষেককে ঘিরে।
৫ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে বিশপ পল গমেজের বিশপীয় অভিষেকের জন্য বেনীদুয়ার মিশনের সামনের সজ্জিত সুবিশাল মাঠ কানায় পূর্ণ হয়ে যায় সকাল ৯টার মধ্যেই। সময়ের সাথে সাথে প্যাণ্ডেলের চারিপাশে মানবপ্রাচীর গড়ে ওঠে অভিষেক অনুষ্ঠানে আসা মানুষের ভিড় দিয়ে। প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক খ্রিস্টভক্ত সেই অভিষেক খ্রিস্টযাগে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও সিএসসি, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভাটিকানের রাষ্ট্রদূত আর্চবিশপ ক্যাভিন রান্ডাল, ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ ওএমআই, রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপ জের্ভাস রোজারিও, বাংলাদেশের অন্যান্য ধর্মপ্রদেশের বিশপগণ, নাটোর ও নওগাঁ জেলার সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ’সহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক, ফাদার, সিস্টার, ব্রাদারগণ।
বেণীদুয়ার ধর্মপল্লীর প্রাঙ্গণ সকাল সকালই ধর্মীয় সঙ্গীতের মূর্ছনায় মেতে উঠে। পবিত্র খ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে এই বিশপীয় অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অভিষেককারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিশপ জের্ভাস রোজারিও, সহ-অভিষেককারী হিসেবে ছিলেন আর্চবিশপ কেভিন এস. রান্ডাল এবং আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ ওএমআই।
খ্রিস্টযাগের উপদেশে বিশপ ইম্মানুয়েল কানন রোজারিও বলেন, ঈশ্বর মানুষকে ভালোবাসেন ও যত্ন করেন তা আজকে এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। পুণ্যপিতা পোপ চতুর্দশ লিওকে ধন্যবাদ জানাই যিনি নতুন একটি ধর্মপ্রদেশ ও নতুন ধর্মপাল পল গমেজকে দান করেছেন। বিশপীয় দায়িত্ব একাকী লাভ করা যায় না, বরং ঈশ্বর ভালোবেসে এই পালকীয় দায়িত্ব প্রদান করেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভাটিকানের রাষ্ট্রদূত ক্যাভিন এস. রান্ডাল নবাভিষিক্ত বিশপ পল গমেজকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বিশপ পল বাংলাদেশ মণ্ডলীর জন্য আশির্বাদস্বরূপ। তিনি জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের ভক্তবিশ্বাসীদের ঐশরাজ্যের দিকে পরিচালিত করবেন। এছাড়াও সকল ধর্মের মানুষের সাথে আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে সিনোডালিটি প্রতিষ্ঠা করবেন বলে বিশ্বাস করি।
রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপ জের্ভাস রোজারিও অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, বিশপ পল গমেজ একজন যোগ্য যাজক ছিলেন। আর ঈশ্বর তাঁর এই যোগ্য যাজককে বিশপ হওয়ার জন্য বেছে নিয়েছেন। আজকে জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ মণ্ডলীও অত্যন্ত আনন্দিত। বিশপ পল গমেজের জন্য আমাদের প্রার্থনা খুবই দরকার। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস তিনি জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশ তথা জনগণকে ঈশ্বরের পথে সুন্দরভাবে পরিচালিত করবেন।
নব অভিষিক্ত বিশপ পল গমেজ তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমি আজ প্রথমেই ঈশ্বরকে ও পোপ চতুর্দশ লিও’কে ধন্যবাদ জানাই আমাকে এই গুরুদায়িত্ব প্রদান করার জন্য। একই সাথে আমি রাজশাহীর বিশপ, অন্যান্য বিশপ, ও সর্বস্তরের জনগনকে ধন্যবাদ জানাই। আমি অযোগ্য থাকা সত্ত্বেও ঈশ্বর তাঁর কাজের জন্য আমাকে বেছে নিয়েছেন। আমার বিশপীয় জীবনে আপনাদের সমর্থন ও প্রার্থনা অত্যন্ত প্রয়োজন। আপনাদের প্রার্থনার গুণে ও সহযোগীতায় জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের সার্বিক উন্নয়ন হবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।”
পবিত্র খ্রিস্টযাগের পর ছিলো নবাভিষিক্ত বিশপ পল গমেজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। নৃত্য ও গানে বিশপকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়। এছাড়াও ছিলো বিশপীয় অভিষেক স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন। আরো ছিলো বিভিন্ন কৃষ্টি-সংস্কৃতির সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সাঁন্তালী কনসার্ট। নবগঠিত জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের কাথিড্রাল হিসেবে জেলা শহর খঞ্জনপুরের মা মারীয়া আমাদের সহায় ধর্মপল্লীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশপ অভিষেকের আগের দিন, ৪ জুন, বিকালে বিশপ পল গমেজের মঙ্গলকামনায় অভর্থনা, পবিত্র আরাধনা ও মঙ্গলানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিশপ, ফাদার, সিস্টার এবং বিশপ পল গমেজের আত্মীয়-স্বজনগণ বিশপের মঙ্গলকামনায় প্রার্থনা ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। বেণীদুয়ার ধর্মপল্লীতে বিশপদের আগমনের সাথে সাথে সাঁন্তালী, মাহালী, ওঁরাও ও মুণ্ডারী কৃষ্টিতে নেচে ও পা ধুইয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য ২৫ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, পুণ্যপিতা পোপ চতুর্দশ লিও জয়পুরহাট’কে নতুন ধর্মপ্রদেশ এবং ফাদার পল গমেজকে বিশপ মনোনীত ঘোষণা করেন। ৫ জুন অভিষেকের মধ্য দিয়ে বিশপ পল গমেজ জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
বিশপ পল গমেজ এর জন্ম রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের মথুরাপুর ধর্মপল্লীর খরবাড়িয়া গ্রামে ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে। তার পিতা-মাতার নাম স্বর্গীয় বানার্ড গমেজ ও স্বর্গীয়া পেরপেতুয়া কস্তা। তিনি ডিকন পদে অভিষেক লাভ করেন ১৮ ডিসেম্বর ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে আর ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিশপ প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও সিএসসি কর্তৃক যাজকীয় অভিষেক লাভ করেন।
৬৪ বছর বয়স্ক নতুন বিশপ পল গমেজ তার পালকীয় জীবনে সুরশুনিপাড়া, বেণীদুয়ার, বোর্নী, রাজশাহী কাথিড্রাল ধর্মপল্লীতে কাজ করছেন। এছাড়াও তিনি যীশুনাম গৃহ সুইহারী দিনাজপুরে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৯৮-২০০০ পর্যন্ত ফিলিপাইনের সান্তো টমাস বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন। দেশে ফিরে তিনি রমনা ও পবিত্র আত্মা সেমিনারী, বনানীর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপের পরামর্শক ও ভিকার জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
নবগঠিত জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সাথে নতুন ধর্মপাল বিশপ পল গমেজের একত্রিত যাত্রা হয়ে ওঠুক ঐশরাজ্য প্রকাশ ও বিস্তারের এক দৃশ্যমান চিহৃ। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে আমাদের সম্মিলিত প্রার্থনা বিশপ পল গমেজের নেতৃত্বে জয়পুরহাট ধর্মপ্রদেশ হয়ে ওঠুক সিনোডাল মণ্ডলী।
