ঐশ অনুগ্রহে আর্শীবাদিত, সেবায় নিবেদিত ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের হীরক জয়ন্তী (৭৫ বছর) পালনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান

গত ২১ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহ্যবাহী সেন্ট মেরীস ক্যাথিড্রালে আনন্দ সহকারে  ‘মহাধর্মপ্রদেশে উন্নীত’ হবার ৭৫ বছরের পূর্তি বা হীরক জয়ন্তী পালন করে ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশ। বিকাল ৪টা থেকেই মহাধর্মপ্রদেশের বিভিন্ন ধর্মপল্লী ও প্রতিষ্ঠান থেকে ভক্তজন, সন্ন্যাসব্রতী নর-নারী ও যাজকেরা আর্চবিশপ ভবনে মিলিত হতে থাকেন। চা-চক্রের পরে বিকাল ৫টায় বিশপ সুব্রত বি, গমেজের স্বাগত বক্তব্যের মধ্যদিয়ে শুরু হয় উদ্বোধন অনুষ্ঠান।

হীরক জয়ন্তীর লগো ও ইতিহাস কর্ণার উন্মোচন করেন আর্চবিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ, ওএমআই; কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও, সিএসসি; বিশপ সুব্রত বি. গমেজ; বিশপ থিয়োটনিয়াস গমেজ, সিএসসি সহ  বর্ষীয়ান ফাদার হিউবার্ট গমেজ, সিস্টার পলিন, সিএসসি, ব্রাদার বেনেডিক্ট রোজারিও সিএসসি, মিশনারী ফাদার জন পাওলো, শ্রদ্ধেয়া মার্গারেট ডি’কস্তা, শ্রদ্ধেয় আলবার্ট ও অতুল এরিক গমেজ। লগো উন্মোচনের পরপরই আর্চবিশপ মহোদয় হীরক জয়ন্তীর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এরপর লগোর ব্যাখা তুলে ধরেন সিস্টার মেরী নমিতা, এসএমআরএ।

বিশ্বাসের কেন্দ্রে অবস্থিত পুনরুত্থান প্রদীপ প্রজ্জলন করেন মহামান্য কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও, সিএসসি। শাওন গমেজের পরিচালনায় তুমিলিয়া সেন্ট মেরীস স্কুল এণ্ড কলেজের ছাত্রীরা দৃষ্টিনন্দন উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করেন।এরপর মহাধর্মপ্রদেশের সুদীর্ঘ সময়ের ইতিহাস অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করেন ফাদার থিওটোনিয়াস প্রশান্ত রিবেরু।

ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে নাচ ও গান পরিবেশন করেন ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের যুব কমিশনের সদস্য ও রমনা সেমিনারীর সেমিনারীয়ানেরা। নাচ-গানের পরপরই আনন্দের বহিঃপ্রকাশে বেলুন উড্ডয়ন করেন কার্ডিনাল, বিশপগণসহ সেন্ট মেরীস ক্যাথিড্রাল ধর্মপল্লীর পালক পুরোহিত ফাদার ডেভিড গমেজ।

ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের বিশ্বাসের যাত্রার প্রতীকী হিসেবে বিশেষ শোভাযাত্রায় সকলে অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, বাণীপ্রচার, আর্থিক উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়ন – এগুলোর মধ্যদিয়ে  ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশ বিশেষভাবে তার বিশ্বাসীয় সেবাকাজ করছে এবং করে যাবে বলে তারা প্রজ্জলিত প্রদীপ পুনরুত্থান প্রদীপের পাশে রেখে নিজেদেরকে আলোকিত করেছে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানের শেষে শুরু হয় মহাখ্রিস্টযাগ। খ্রিস্টযাগে প্রধান পৌরহিত্য করেন আর্চবিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ, ওএমআই। তিনি তার উপদেশে বলেন, এ ধর্মপ্রদেশ ঈশ্বরের অনেক অনুগ্রহ পেয়েছে ও পাচ্ছে। একইসাথে এই মহাধর্মপ্রদেশের রয়েছে বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সোন্দর্য এবং ভক্তজনগণের উদারতা। যার মধ্যদিয়ে তারা নিজেরা বিশ্বাসীয় জীবনে গভীরে যায় এবং অন্যদের সাথে বিশ্বাস সহভাগিতা করতে পারে। খ্রিস্টযাগ শেষে বিশপ সুব্রত বি, গমেজ হীরক জয়ন্তী পালনের কিছু দিক নির্দেশনা রাখেন ও সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

খ্রিস্টযাগে ৭৫জন যাজকসহ খ্রিস্টভক্ত ও সন্ন্যাসব্রতী নর-নারী মিলে মোট প্রায় ৪০০ জন উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, একই দিনে ইস্টার পুনর্মিলনী হওয়াতে ধর্মপ্রদেশের প্রতিটি ধর্মপল্লী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিনিধিগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় প্রীতিভোজের মাধ্যমে মিলনোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

বঙ্গে তথা বংলাদেশে খ্রিস্টানদের উপস্থিতি পাঁচশত বছরের অধিক সময় থেকে| বঙ্গে পর্তুগীজদের আগমনের (১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ) সাথে সাথে তা স্পষ্ট হয়| কেননা মনে করা হয়, খ্রিস্টবিশ্বাসী পর্তুগীজগণই খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তন করেন এ বাংলায়|

১| ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে মাদ্রাজের মাইলাপুর; ধর্মপ্রদেশের স্বীকৃতি পেলে ঢাকাসহ সমগ্র বঙ্গের খ্রিস্টবিশ্বাসীরা এ ধর্মপ্রদেশের আওতাভুক্ত হন|

২| ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে ১৮ এপ্রিল সমগ্র বঙ্গকে মাইলাপুরের অধীনে রেখেই পাদ্রিয়ানো চুক্তির বাইরে গিয়ে পোপীয় বিশ্বাস বিস্তার সংস্থার অধীনে ভিকারিয়েট অ্যাপস্টলিকের মর্যাদায় উন্নীত করলে ঢাকা বঙ্গীয় ভিকারিয়েটের অন্তর্ভুক্ত হয়|

৩| ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গীয় ভিকারিয়েট পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গে বিভক্ত করে পোপ ৯ম পিউস পূর্ববঙ্গের অ্যাপস্টলিক ভিকারিয়েটের দায়িত্ব অর্পণ করেন বিশপ টমাস অলিভকে| ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বঙ্গীয় ভিকারিয়েট আনুষ্ঠানিকভাবে কোলকাতা ভিকারিয়েট থেকে পৃথক হয়ে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়| ঐ সময় পূর্ব বঙ্গীয় ভিকারিয়েটের আওতাধীন ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, আসাম ও আরাকান অঞ্চল|

৪| ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে হলিক্রস ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টার সমন্বিত মিশনারী প্রথম দল ঢাকায় আসেন|

৫| ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ১ সেপ্টে¤^র পোপ ত্রয়োদশ লিও পোপীয় ˆপ্ররিতিক অনুশাসনপত্র (হুমানে সালুতিস) দ্বারা ঢাকাকে ধর্মপ্রদেশ ঘোষণা করেন| সে ঘোষণায় বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মহাধর্মপ্রদেশ এলাকা, আসামের শিলাচর ও বার্মার প্রোম এলাকা ঢাকার অন্তর্ভূক্ত ছিল| ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে পোপ ত্রয়োদশ লিও ফরাসী যাজক ফাদার আগষ্টিন লুয়াজ, সিএসসিকে ঢাকা ধর্মপ্রদেশের প্রথম বিশপ মনোনীত করেন| তিনি ১১ জানুয়ারি, ১৮৯১ অভিষিক্ত হয়ে একই সনের ১০ মার্চ লক্ষ্মীবাজারে এসে বিশপীয় দায়িত্ব নেন| ঐ সময় থেকে লক্ষ্মীবাজার পরিচিত হয় ‘হলিক্রস ক্যাথিড্রাল’ হিসেবে|

৬| ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে রমনায় অবস্থিত বর্তমান আর্চবিশপ ভবনটি বিশপ আরমা ল্যাঁগ্রার পরিকল্পনা ও ভিকার জেনারেল ফাদার তিমথি ক্রাউলীর অত্যন্ত পরিশ্রম ও তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়|

৭| ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে পোপ ১১শ পিউস ঢাকাকে বিভক্ত করে ‘চট্টগ্রাম’ ধর্মপ্রদেশ প্রতিষ্ঠা করেন| চট্টগ্রামের প্রথম বিশপ নিযুক্ত হন বিশপ আলফ্রেড ল্য পাইয়োর, সিএসসি|

৮| ১৫ জুলাই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে পুণ্যপিতা দ্বাদশ পিউস ঢাকা ধর্মপ্রদেশকে কোলকাতা মহাধর্মপ্রদেশ থেকে পৃথক করে ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশে উন্নীত করেন এবং বিশপ লরেন্স লিও গ্রেণার, সিএসসিকে ঢাকার প্রথম আর্চবিশপ মনোনীত করেন| 

৯| ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই আর্চবিশপ লরেন্স  গ্রেণার, সিএসসির জারিকৃত এক নির্দেশনাবলে কাকরাইলের গির্জাটিকে ‘ধন্যা কুমারী মারীয়ার অমলোদ্ভবার ক্যাথিড্রাল’- এ উন্নীত করা হয়| পরে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে আর্চবিশপ থিওটোনিয়াস অমল গাঙ্গুলী সিএসসি কাকরাইলের ক্যাথিড্রালের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করেন ‘সেন্ট মেরীস ক্যাথিড্রাল’| উল্লেখ্য প্রথম বাঙালি বিশপ থিওটোনিয়াস অমল গাঙ্গুলী, সিএসসি ৭ অক্টোবর, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে কাকরাইল, রমনার এই ক্যাথিড্রালেই বিশপরূপে অভিষিক্ত হন এবং ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দের ২ সেপ্টে¤^র মৃত্যুবরণ করেন|

১০| ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মে পোপ ২য় জন পল ঢাকাকে বিভক্ত করে ময়মনসিংহকে নতুন ধর্মপ্রদেশ বলে ঘোষণা দেন এবং ফাদার ফ্রান্সিস আন্তুনী গমেজকে প্রথম বিশপ হিসেবে মনোনীত করেন|

১১| ২০০০ খ্রিস্ট জয়ন্তী পালন-উত্তর ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশের নতুন পালকীয় ক্ষেত্র গাজীপুর-মানিকগঞ্জ-সাভার (গামাসা) বিশেষ মনোযোগে আসে|

১২| ৮ জুলাই ২০১১ খ্রিস্টাব্দে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট সিলেটকে ঢাকা থেকে পৃথক করে নতুন ধর্মপ্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বিশপ বিজয় এন ডি’ক্রুজ, ওএমআইকে সিলেটের প্রথম বিশপ হিসেবে মনোনীত করেন|

১৩| চারটি ধর্মাঞ্চল ( ঢাকা শহার, ভাওয়াল, আঠারোগ্রাম ও গামাসা) নিয়ে ঢাকা মহাধর্মপ্রদেশ গঠিত| 

 

সংবাদদাতা: নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Reply