৬০তম বিশ্ব যোগাযোগ দিবস উপলক্ষে পোপ চতুর্দশ লিও’র বাণী

৬0তম বিশ্ব যোগাযোগ দিবস উপলক্ষে পোপ চতুর্দশ লিও বাণী

মানব কণ্ঠস্ব মুখমণ্ডল সংরক্ষণ

প্রিয় ভাই বোনেরা,

মুখমণ্ডল ও কণ্ঠস্বর প্রত্যেক মানুষের অনন্য ও স্বতন্ত্র  বৈশিষ্ট্য| এগুলো একজন ব্যক্তির অদ্বিতীয় বা অনন্য পরিচয় প্রকাশ করে এবং অন্যদের সঙ্গে প্রত্যেক সাক্ষাতের মৌলিক উপাদান হয়ে ওঠে| প্রাচীন মানুষরা এই সত্যটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন| মানব ব্যক্তিকে সংজ্ঞায়িত করতে প্রাচীন গ্রীকরা “মুখ”(prósōpon) শব্দটি ব্যবহার করত, কারণ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো যা কারও দৃষ্টির সামনে উপস্থিত থাকে; উপস্থিতি ও সম্পর্কের স্থান| অন্যদিকে লাতিন শব্দ “ব্যক্তি” (person, per-sonare থেকে) ধ্বনির ধারণাকে তুলে ধরে: তবে শুধু কোনো সাধারণ শব্দ নয়, বরং কারও কণ্ঠের সেই অচিন্তনীয় স্বাতন্ত্র্যময় ধ্বনি|

মুখমণ্ডল ও কণ্ঠস্বর পবিত্র| ঈশ্বর, যিনি তাঁর নিজস্ব প্রতিমূর্তি ও সদৃশতায় আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি যখন তাঁর বাণীর মাধ্যমে আমাদের জীবন দান করলেন, তখনই তিনি আমাদের এই মুখ ও কণ্ঠ দিয়েছেন| এই বাণী যুগে যুগে ভাববাদীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে এবং সময়ের পূর্ণতায় দেহ ধারণ করেছে| আমরাও এই বাণীকে শুনেছি ও দেখেছি (তুলনীয়: ১ যোহন ১:১-৩)| যার মধ্যে ঈশ্বর নিজেকে আমাদের কাছে প্রকাশ করেন কারণ তা ঈশ্বরপুত্র যিশুর কণ্ঠ ও মুখমণ্ডলের মাধ্যমে আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে|

সৃষ্টির সূচনা থেকেই ঈশ্বর চেয়েছিলেন যে নর ও নারী তাঁর সংলাপক হোক| নিসার সাধু গ্রেগরি যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, ঈশ্বর আমাদের মুখমণ্ডলে তাঁর প্রেমের প্রতিফলন অঙ্কিত করেছেন, যাতে আমরা প্রেমের মধ্য দিয়ে আমাদের মানবত্ব পূর্ণভাবে জীবিত করতে পারি| অতএব মানব মুখমণ্ডল ও কণ্ঠস্বর সংরক্ষণ করার অর্থ হলো এই চিহ্নটিকে, ঈশ্বরের প্রেমের এই অমোচনীয় প্রতিফলনকে সংরক্ষণ করা| আমরা এমন কোনো প্রজাতি নই যা পূর্বনির্ধারিত জৈব-রাসায়নিক সূত্রের সমষ্টি| আমাদের প্রত্যেকের রয়েছে এক অনন্য ও অনুকরণাতীত আহ্বান, যা আমাদের নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত হয় এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়|

যদি আমরা এই সংরক্ষণের দায়িত্বে ব্যর্থ হই, তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি মানব সভ্যতার কিছু মৌলিক ভিত্তিকে আমূল পরিবর্তন করার হুমকি হয়ে দাঁড়ায় আর যে ভিত্তিগুলোকে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নিই| মানবিক কণ্ঠ, মুখমণ্ডল, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান, চেতনা ও দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বকে অনুকরণ করার মাধ্যমে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” নামে পরিচিত ব্যবস্থাগুলো শুধু তথ্যের পরিবেশেই হস্তক্ষেপ করছে না, বরং যোগাযোগের গভীরতম স্তর আর মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনুপ্রবেশ করছে| অতএব, চ্যালেঞ্জটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি মূলত নৃতাত্ত্বিক বা মানবকেন্দ্রিক| মানব মুখ ও কণ্ঠস্বর রক্ষা করার অর্থ শেষ পর্যন্ত নিজেদেরকেই রক্ষা করা| সাহস, দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগগুলোকে গ্রহণ করা মানে এই নয় যে, আমরা এর জটিলতা, সংকট ও ঝুঁকির বিষয়গুলো উপেক্ষা করব|

 চিন্তা করার ক্ষমতাকে ত্যাগ করো না

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সক্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য তৈরি করা অ্যালগরিদমগুলো প্রকাশ করে যে, আবেগপ্রবণ হয়ে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া জানানোকে পুরস্কৃত করার সাথে সাথে বোঝার বা গভীরভাবে চিন্তা করার পরে সময় নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানানো মানুষের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম| সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে নেতিবাচক অর্থে সহজে সবাই একই মতামত ধারণ করে এবং জনগণকে গোষ্ঠীবদ্ধ করে ফেলে| ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের শ্রবণ এবং বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা করার ক্ষমতাকে হ্রাস করে ও সামাজিক বিভাজন বাড়ায়|

সকল জ্ঞানের উৎস, বন্ধু, সংরক্ষণাগার এবং পরামর্শদাতা হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্লেষণাত্মক, সৃজনশীল চিন্তা, অর্থ বোঝা, বাক্য গঠন এবং শব্দার্থের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতাকে হ্রাস করে ফেলে| যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দীর্ঘমেয়াদী যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে তবু এটা নিশ্চিত যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের বৌদ্ধিক, আবেগিক ও যোগাযোগের দক্ষতা হ্রাসের ক্ষেত্রে কাজ করে| সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পড়াশুনা, সঙ্গীত ও ভিডিওগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিয়েছে| এর ফলে মানুষের সৃজনশীল শিল্পের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে ফেলে তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তকমায় চলে যাবার ঝুঁকিতে রয়েছে| এটি মানুষকে চিন্তাহীন ভোক্তা ও বেনামী পণ্যের ওপর পরোক্ষ নির্ভরশীল করে তুলছে| ইতিমধ্যে সঙ্গীত, শিল্প ও সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে মানুষের প্রতিভাকে বাদ দিয়ে যন্ত্রের প্রতিভা দ্বারা তা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এদিকে সঙ্গীত, সৃজনশীল শিল্প এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে মানব প্রতিভার অমর সৃষ্টিগুলো শুধুমাত্র মেশিনের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে|

এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী করতে পারে বা সক্ষম তা নয়; তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মানবতা ও জ্ঞানবৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা কী অর্জন করতে পারি এবং কী করতে সক্ষম হব! অনেকেই গবেষণা ও কাজ ছাড়াই ফল অর্জনের চেষ্টা করছে; যাইহোক, সৃজনশীলতা ত্যাগ, মানসিক সক্ষমতা পরিহার ও কল্পনা শক্তিকে মেশিনের নিকট সমর্পণ করার অর্থ হল ঈশ্বর ও মানুষের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির প্রতিভাগুলোকে কবরস্থ করা| আর এর অর্থ হলো- আমাদের মুখ লুকিয়ে রাখা এবং কণ্ঠস্বরকে নীরব করা|

হওয়া বা হওয়ার ভান করা: সম্পর্ক বাস্তবতা অনুকরণ

আমরা যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ফিড স্ক্রল করি, তখন প্রায়ই বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে যে, আমরা সত্যিকারের মানুষের সাথে যোগাযোগ করছি, নাকি “বট’বা “ভার্চুয়াল প্রভাবকারী’র সাথে তা করছি| এসব স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অস্বচ্ছ হস্তক্ষেপ জনমত গঠন ও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে| বৃহৎ ভাষা মডেল ভিত্তিক চ্যাটবটগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক যোগাযোগকে ক্রমাগত উন্নত করার মাধ্যমে নীরবে মানুষকে প্রভাবিত করতে দারুণভাবে কার্যকর হয়ে ওঠছে|

 ফলে চ্যাটবটগুলো জনসাধারণের কথা, অনুভূতি ও পছন্দকে বুঝতে এবং অনুকরণ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে সম্পর্কে এক ধরনের ভান সৃষ্টি হয়| চ্যাটবটগুলোর অনুকরণ করার এই ক্ষমতা অজ্ঞদের জন্য বিনোদন ও প্রতারণামূলক| যেহেতু চ্যাটবটগুলো স্নেহপূর্ণ ও সর্বদা হাতের নাগালে এবং পরিমাণে সংখ্যায় অনেক তাই আমাদের মনকেও গ্রাস করে ফেলে এবং সম্পর্ককে আক্রমণ ও দখল করে ফেলে|

যে প্রযুক্তি মানুষের সম্পর্কের প্রয়োজনকে কাজে লাগায়, তা কেবল ব্যক্তিগত জীবনে কষ্টকর পরিণতিই ডেকে আনে না; বরং সমাজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে| এমনটি ঘটে যখন আমরা মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করি, যা আমাদের চিন্তাভাবনাকে ক্যাটালগ করে ফেলে এবং আমাদের চারপাশে আয়নার মতো একটি জগৎ ˆতরি করে, যেখানে সবকিছুই “আমাদের প্রতিচ্ছবি ও সদৃশে” নির্মিত হয়| আর এইভাবে আমরা অন্যের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ হারিয়ে ফেলি| আসলে অন্যকে গ্রহণ না করলে প্রকৃত সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে না|

এই উদীয়মান মাধ্যমগুলোর কারণে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পক্ষপাত; যা বাস্তবতা উপলব্ধি করতে সমস্যা সৃষ্টি করে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ফল বিশ্লেষণ করে মানুষের উপর তার নির্মাতাদের চিন্তা চাপিয়ে দিতে পারে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গাণিতিক পরিভাষায় স্বচ্ছতার অভাব ও তথ্যে সামাজিক প্রতিনিধিত্বের অপর্যাপ্ততা আমাদের এমন জালে আবদ্ধ করে, যা আমাদের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সামাজিক ˆবষম্য ও অবিচারকে দীর্ঘায়িত এবং তীব্র করে|

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ঝুঁকি সব সময়ই বেশি| এটির অনুকরণ করার ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, তা আমাদের “মুখমণ্ডল ও কণ্ঠস্বর’ ব্যবহার করে সমান্তরাল ‘বাস্তবতা’তৈরি করে আমাদেরকে প্রতারিত করতেও সক্ষম| আমরা বহুমাত্রিকতার জগতে এমনভাবে ডুবে যাচ্ছি যেখানে কল্পকাহিনী থেকে বাস্তবতাকে আলাদা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে|

অশুদ্ধতা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তোলে| যে ব্যবস্থাগুলো পরিসংখ্যানগত সম্ভাবনাকে জ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করে সেগুলো বড়জোর আমাদের সত্যের আনুমানিক ধারণা প্রদান করে, যা বিভ্রান্তিমূলক| সত্যের উৎস যাচাই না করা, মাঠপর্যায়ের তথ্যবিভ্রাট, ঘটনার স্থান পরিদর্শন না করা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে যার ফলে অবিশ্বাস, বিভ্রান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়|

একটি সম্ভাব্য চুক্তি

আমাদের প্রভাবিত করে এমন বিশাল অদৃশ্য শক্তির পিছনে কেবলমাত্র হাতেগোনা কয়েকটি সংস্থা রয়েছে, যাদের প্রতিষ্ঠাতাদের সম্প্রতি “পার্সন অফ দ্য ইয়ার ২০২৫” বা “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্থপতি” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে| এটি সমস্যা সমাধানের এমন সুসংগঠিত প্রয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমিত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে উদ্বেগের জন্ম দেয় যা আচরণকে সূক্ষ্মভাবে প্রভাবিত করে এবং মণ্ডলীর ইতিহাসসহ মানব ইতিহাসকে পুনর্লিখন করতে সক্ষম, অনেক সময় আমরা তা টেরও পাইনা|

আমাদের সামনে যে কাজটি রাখা হয়েছে তা ডিজিটাল উদ্ভাবনকে থামানো নয় বরং এটিকে পরিচালিত করা এবং এর ˆদ্বত প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন থাক| মানুষকে রক্ষায় আমাদের কণ্ঠ তুলে ধরা প্রত্যেকের দায়িত্ব যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সত্যিকার অর্থে বন্ধু হিসেবে ভাবতে পারি| এই মিত্রতা সম্ভব; তবে তিনটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে হওয়া দরকার: দায়িত্বশীলতা, সহযোগিতা এবং শিক্ষা|

প্রথমত, দায়িত্বশীলতা| আমরা যে ভূমিকা পালন করি তার উপর নির্ভর করে দায়িত্বকে সততা, স্ব^চ্ছতা, সাহস, দূরদর্শিতা, জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার কর্তব্য বা তথ্য জানার অধিকার| তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে, আমরা যে ভবিষ্যত গড়ে তুলছি তার জন্য কেউ ব্যক্তিগত দায় এড়াতে পারে না| অনলাইন প্লাটফর্মের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এর অর্থ হল- এটা নিশ্চিত করা যে তাদের ব্যবসায়িক কৌশলগুলো কেবলমাত্র মুনাফা সর্বোচ্চ করার মানদণ্ডের ওপর নির্ভর করে না বরং একটি দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারাও পরিচালিত হয়; ঠিক যেমন তারা প্রত্যেকে তাদের নিজ সন্তানদের মঙ্গলের জন্য যত্নশীল| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মাতাদের বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি করার নকশা নীতি ও সংযমের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং সামাজিক দায়িত্বের বিষয়ে জানানো হয়েছে যাতে ব্যবহারকারীদের মধ্য থেকে গঠনমূলক মতামত পাওয়া যায়| এই দায়িত্ব সমন্ধে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রকদেরও জানা প্রয়োজন যাতে তারা মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে| এছাড়াও নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিদের মাধ্যমগুলোর সাথে মানসিক সংযুক্তি তৈরি করা থেকে রক্ষা এবং প্রতারণামূলক তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তুর বিস্তার রোধ করতে পারে|

সত্য অনুসন্ধ্যান করাই মিডিয়া ও যোগাযোগসংস্থাগুলোর মূল লক্ষ্য হলেও সেগুলো এমন অ্যালগরিদমকে প্রাধান্য দিতে পারে না যেগুলো যেকোনো মূল্যে মানুষের মনোযোগ টানতে কিছু বেশি সেকেন্ড সময় নেয়| তাই মনে রাখা দরকার- কোন প্রকার ব্যস্ততার পিছনে তাড়া করে নয় বরং নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতার দ্বারা জনগণের আস্থা অর্জন করা যায়| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি বিষয়কে মানুষের দ্বারা তৈরি বিষয়বস্ত থেকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত এবং আলাদা করতে হবে| সাংবাদিক ও যারা শৈল্পিক কাজের সাথে যুক্ত তাদের কাজের সত্ত্বাধিকার এবং মালিকানা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে| তথ্য সরবরাহ অবশ্যই জনগণের কল্যাণের নিমিত্তে যেন হয়| গঠনমূলক এবং অর্থপূর্ণ জনসেবা কখনো অস্বচ্ছতার উপর নির্ভর করে নয় তবে উৎসের স্বচ্ছতা, জড়িতদের অন্তর্ভুক্তি এবং উচ্চ মানসম্পন্ন বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে সংগঠিত হয়|

সকলকে সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে| ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ কোন সেক্টর একা মোকাবেলা করতে পারে না| তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে এসে সবার জন্য সুরক্ষা বিষয়টি ভাবা দরকার| সচেতন এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিকত্ব ˆতরি এবং বাস্তবায়নে সকল স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রযুক্তি শিল্প, আইনপ্রণেতা, সৃজনশীল কোম্পানি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পী থেকে সাংবাদিক এবং শিক্ষাবিদদের জড়িত থাকতে হবে|

শিক্ষার লক্ষ্য হল সুনির্দিষ্টভাবে কার্যসম্পাদন: ব্যক্তিগত সক্ষমতা উৎঘাটনের জন্য বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিতে চিন্তা করা; উৎসগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা সমন্ধে মূল্যায়ন এবং তথ্য সংগ্রহের পিছনে সম্ভাব্য আগ্রহ; মানসিক প্রক্রিয়া বুঝা; পরিবার, সম্প্রদায় ও সংগঠনগুলোতে স্বাস্থ্যকর যোগাযোগ এবং আরও দায়িত্বশীল সংস্কৃতি তৈরি করা দরকার|

এই কারণে, শিক্ষা ব্যবস্থায় মিডিয়া, তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালু করা অতীব জরুরী; ইতিমধ্যে কিছু বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে চালু করা হয়েছে| কাথলিক হিসেবে আমরা এই প্রচেষ্টায় অবদান রাখতে পারি এবং অবশ্যই রাখা দরকার| বিশেষ করে তরুণরা যেন সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং আত্মার স্বাধীনতায় বেড়ে উঠে| এই শিক্ষাকে সমগ্র জীবনের সাথে একীভূত করা উচিত| বয়স্ক, প্রাপ্তবয়স্ক এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার; যারা প্রযুক্তির পরিবর্তনশীল সময়ে নিজেদের বর্জিত এবং শক্তিহীন মনে করে|

মিডিয়া, তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা ব্যক্তিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৃতাত্ত্বিক প্রবণতাগুলোকে এড়াতে সাহায্য করে এবং তাদের সিস্টেমগুলোকে শুধু যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সৃষ্ট উৎসগুলোকে ভুল প্রমাণিত করে| সুরক্ষা সচেতনতা বৃদ্ধি, গোপনীয়তা এবং তথ্য সুরক্ষা বিষয়ে শিক্ষা দেয়| কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে হয় সে বিষয়ে নিজেকে এবং অন্যদেরও শিক্ষা দেয়| এই প্রসঙ্গে ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিত ছবি, অডিও, ভিডিও, ব্যক্তি এবং কণ্ঠ রক্ষা যেমনি জরুরী, তেমনি ডিজিটাল জালিয়াতি, সাইবার বুলিং ও নকল ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা জরুরী| শিল্প বিপ্লব যেমন মানুষকে নতুন উন্নয়নে সাড়া দিতে আহ্বান জানায় তেমনি ডিজিটাল বিপ্লবও মানবতাবাদী ও সাংস্কৃতিক শিক্ষায় আলোকিত করে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাগুলো কীভাবে কাজ করে, কী প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজগুলো আমরা পাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক নীতি এবং মডেলগুলো কীভাবে পরিবর্তন হয় তা জানতে ডিজিটাল বিপ্লব সহায়তা করে| মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য আমাদের মুখমণ্ডল ও কণ্ঠের প্রয়োজন বার বার| যোগাযোগের উপহারটিকে মানবতার গভীরতম সত্য বলে লালন করতে হবে, যার দিকে সকল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনও নির্দেশিত হওয়া উচিত|

এই ভাবনাগুলো তুলে ধরতে গিয়ে, আমি সকলকে ধন্যবাদ জানাই যারা উপরে বর্ণিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছেন এবং যারা মিডিয়ার মাধ্যমে জনকল্যাণের জন্য কাজ করছেন তাদের আশির্বাদ করি|

ভাটিকান থেকে ২৪ জানুয়ারি ২০২৬,                                                                    পোপ চতুর্দশ লিও

সাধু ফ্রান্সিস ডি’সেলসের স্মরণদিবস

ভাষান্তর: ফাদার তপন ডিরোজারিও ফাদার সাগর কোড়াইয়া

Leave a Reply