ধর্মীয় ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় সম্মানী গ্রহণ প্রসঙ্গে কাথলিক মণ্ডলীর অবস্থান

তারিখ: ১৪ মার্চ ২০২৬

মহামান্য প্রধানমন্ত্রী

জনাব তারেক রহমান

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি’র) নিরঙ্কুশ বিজয়ের সংবাদে বাংলাদেশের খ্রিস্টান সমাজের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে ও আপনার দলের বিজয়ী সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আমরা বিশ্বাস করি, এই সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার এবং সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করবেন। সংখ্যার দিক থেকে আমরা খ্রিস্টানগণ বাংলাদেশে কম হলেও দেশের ও দশের উন্নয়নে আমরা সবসময়ই বিশেষ অবদান রেখে চলেছি। সে ধারা অব্যাহত রেখে আমাদের অবস্থান থেকে সুশিক্ষা, স্বাস্থ্য-সেবা, উন্নয়ন ও গঠনমূলক কাজ এবং দীন-দরিদ্র মানুষের সেবা-কার্যক্রমে আমাদের অংশগ্রহণ আপনার হাতকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করছি।

সরকার গঠন করেই আপনি দরিদ্র মহিলাদের জন্য ফ্যামিলী কার্ডের ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন। ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার অধ্যক্ষদের সন্মানী প্রদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আপনার এই মহৎ উদ্যোগ, উদার মনোভাব ও সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

খ্রিষ্টান পুরোহিত ও পালকদের এই সম্মানী গ্রহণ সম্পর্কে কাথলিক খ্রিষ্টান এবং কয়েকটি চার্চের একটু ভিন্নমত রয়েছে তা হলো:

প্রথমত: খ্রিষ্টানদের বিবেচনায় ধর্ম ও রাষ্ট্র আলাদা। আমরা এই দু’টোকে এক করে দেখি না। এখানে ধর্মতাত্বিক বিষয় নিহিত আছে।

দ্বিতীয়ত: পুরোহিত ও পালকগণ খ্রিষ্টানদের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, নৈতিক শিক্ষা ও পালকীয় সেবা দান করে থাকেন। আধ্যাত্মিক দিক থেকেও আমাদের যুক্তি হলো যাদের আধ্যাত্মিক সেবা দান করি তাদের উপহার ও অনুদানেই আমাদের জীবন অতিবাহিত করাই যথার্থ ও উপযুক্ত। এই আধ্যাত্মিকতা আমাদেরকে জনগণের সাথে যুক্ত রাখে, তাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে এবং সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্থ থাকতে সহায়তা করে। এই সেবা দানের জন্য খ্রিষ্টবিশ্বসীরা ব্যক্তিগত ও সমাজগতভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। উপহার ও অনুদান প্রদান করার মধ্য দিয়ে খ্রিষ্টভক্তরা ঈশ্বরের প্রতি ও আমাদের প্রতি ভালবাসা ও উদারতার চর্চা করে। খ্রিষ্টভক্তদের কাছে চার্চের উপহার এবং দান প্রদান করা তাদের ধর্ম ও পূজা-অর্জনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরোহিতগণও স্বাধীনভাবে প্রভুর বাণীপ্রচার, আধ্যাত্মিক  ও পালকীয় সেবা দানে তাদের জীবন নিবেদন করেন।

তৃতীয়ত: চার্চের আইন (কাথলিক) অনুসারে পুরোহিতদের ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রীয় ভাতা গ্রহণের বিষয়ে কিছু বিধি নিষেধ রয়েছে। কাথলিক ব্রতধারী নর-নারী ও ফাদারগণ (পুরোহিতগণ) তারা ঘর-সংসার ত্যাগী মানুষ। নিজস্ব ঘর-বাড়ী নেই এবং তাদের কোন পরিবারও নেই। সেবার জন্য তারা কোন বেতনও গ্রহণ করেন না।  ঈশ্বর ও মানুষের সেবায় সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত তাদের জীবন।

পুরোহিতদের জন্য প্রস্তাবিত ভাতা গ্রহণের বিষয়ে বিনয়ের সাথে অপারগতা প্রকাশ করি। তবে উল্লেখ থাকে যে, যদি কাথলিক চার্চের বাইরে অন্য কোন চার্চের পালকগণ এই সম্মানী গ্রহণ করতে চান তাহলে আমাদের কোন আপত্তি নেই কারণ তাদের অনেকের ঘর-সংসার ও পরিবার রয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে কোন সম্মানী গ্রহণ না করলেও আমাদের প্রস্তাব হলো যে, ধর্ম মন্ত্রণালয় বা খ্রিষ্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট্রের মধ্য দিয়ে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য কল্যাণকর সামাজিক কার্যক্রমে সহায়তা করা হোক, বিশেষত: দরিদ্র ছেলেমেয়েদের শিক্ষাভাতা, দরিদ্রদের জন্য চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা, বৃদ্ধ, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের ভাতা দান এবং খ্রিষ্টানদের গির্জা ও সমাজগৃহ নির্মাণ ও নতুন কবরস্থান স্থাপন ও সংস্কার ইত্যাদি কাজে সহায়তা করা হোক। এর ফলে খ্রিষ্টীয় সমাজ উপকৃত হবে।

আমাদের সিদ্ধান্তটি আশা করি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন। আমাদের জন্য সুচিন্তার জন্য আবারও ধন্যবাদ জানাই।

পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আপনাদেরকে প্রজ্ঞা, সততা ও সাহস দান করুন, যাতে আপনারা দেশের মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করতে পারেন এবং জাতিকে আরও উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হন।

নতুন কর্মদায়িত্ব ও নেতৃত্বের জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

 

আর্চবিশপ বিজয় এন. ডি’ক্রুজ, ওএমআই                           

আর্চবিশপ, ঢাকামহাধর্মপ্রদেশ

প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী।

Leave a Reply