‘আশার তীর্থযাত্রা’ বিষয়টিকে প্রতিপাদ্য করে খ্রিস্টজন্মের ২০২৫ বছর স্মরণে জুবিলী উৎসব পালিত হচ্ছে স্থানীয় ও বিশ্বজনীন মণ্ডলীতে। বিশ্বজনীন মণ্ডলীর পুণ্যভূমি রোম নগরীতে জুবিলী উৎসব পালন করতে এবং এক প্রৈরিতিক মণ্ডলীর একতা প্রকাশ করতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন স্তরের বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ মিলিত হচ্ছেন বিশ্বাসের তীর্থস্থান পুণ্যনগরী রোমে। জুলাইয়ের ২৮ থেকে আগস্টের ৩, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে উদযাপিত হয় যুব জুবিলী। এটি বিশ্ব যুব দিবস নয়। জুবিলী বর্ষে বিশ্ব যুবদের বিশেষ জুবিলী উৎসব। কাথলিক মণ্ডলীতে বিশ্ব যুব দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে সাধু পোপ ২য় জন পলের উদ্যোগে। প্রতি ২-৪ বছর অন্তর অন্তর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ বিশ্ব যুব দিবস পালন করা হয়। প্রথম বিশ্ব যুব দিবস উদ্যাপিত হয় রোম নগরীতেই। ঐ সময়ে তর ভেরগাতা ছিল যুব দিবস পালনের অন্যতম স্থান। এ বছরও যুব জুবিলী পালনের অন্যতম প্রধান স্থান হলো সেই তর ভেরগাতা। বিশ্বের ১৫০টি দেশের ১০ লক্ষ যুবক-যুবতী এই জুবিলী উৎসবে অংশগ্রহণ করে।
যুব জুবিলী উৎসবের প্রধান প্রধান ঘটনাবলী:
২৯ জুলাই: সন্ধ্যায় সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে স্বাগত খ্রিস্টযাগ আর্চবিশপ রিনো ফিসিচেল্লার পৌরহিত্যে, সালেসিয়ান যুব ম্যুভমেন্টে জড়িতরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।
৩০-৩১ জুলাই: শহরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও স্থানের মানুষের সাথে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও আত্মিক সংলাপ।
১ আগস্ট: চিরকো মাস্সিমোতে ক্ষমা ও পুর্নমিলন অনুষ্ঠান।
২ আগস্ট (রাত): তর ভেরগাতাতে নিশি জাগরণী প্রার্থনা ও পোপ চর্তুদশ লিও’র ধর্মশিক্ষা।
৩ আগস্ট (সকাল): পুণ্যপিতা পোপ ১৪ লিও’র পৌরহিত্যে যুব জুবিলীর সমাপনী খ্রিস্টযাগ তর ভেরগাতাতে।
পৃথিবীর ১৫০টি দেশের ৫ লক্ষেরও বেশি যুবক জুবিলীতে অংশগ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করে। এর মধ্যে ৬৮% ইউরোপ থেকে। আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকা থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবরা অংশগ্রহণ করে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য থেকেও যুবরা জুবিলীতে অংশগ্রহণ করে।
ভাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স বাসিলিকার সামনের চত্ত্বরে স্বাগতিক খ্রিস্টযাগ উৎসর্গ করেন আর্চবিশপ রিনো ফিসিচেল্লা। খ্রিস্টযাগের শেষে সকলকে অবাক করে দিয়ে পুণ্যপিতা তাঁর গাড়ি নিয়ে চত্ত্বরে আসেন। তিনি যুব তীর্থযাত্রীদের শুভেচ্ছা জানান এবং তাদেরকে জগতের লবণ ও আলো হিসেবে আ্যখায়িত করেন। একইসাথে ঐশ আশার সাক্ষী হতে এবং পৃথিবীর শান্তির জন্য একসাথে প্রার্থনা করতে আহ্বান করেন।
২ ও ৩ আগস্ট যুবকেরা দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে রোম শহরের একপ্রান্তে তর ভেরগাতে (ভাটিকানসিটি থেকে ২৯ কিমি) পৌঁছায়। বিকালের মধ্যে স্থানটি মানুষের সমুদ্রে পরিণত হয়ে যায়। প্রচণ্ড গরম থাকা সত্ত্বেও গান করতে করতে ও বিশ্বাসের সাক্ষ্য দিতে দিতে যুবকেরা
পৌঁছে যায় তর ভেরগাতাতে। সন্ধ্যায় শুরু হয় আরাধনা, শাস্ত্রপাঠ ও ধর্মশিক্ষা। প্রশ্নোত্তর পর্বে পোপ মহোদয় ৩ জন যুবক-যুবতী যারা যথাক্রমে স্পেনিস, ইতালিয়ান ও ইংরেজি ভাষাভাষীর মানুষ তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন। মেক্সিকোর ২৩ বছর বয়সী দুলচে মারীয়া অনলাইন বা ইন্টারনেটের অস্থায়ী ও মায়াময় বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এনে ১ম প্রশ্নে বলে, আমরা কীভাবে প্রকৃত বন্ধুত্ব ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা খুঁজে পেতে পারি, যা আমাদেরকে সত্যিকারের আশার পথে নিয়ে যাবে? উত্তরে পুণ্যপিতা বলেন, যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদেরকে সংলাপের অপূর্ব সুযোগ দান করে তথাটি এটি আমাদেরকে নিশ্চল ও ভোগবাদে আসক্ত করে রাখতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রকৃত বন্ধুত্ব তখনই স্থায়ী হতে পারে যখন তা ঈশ্বরের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। গায়া নামে ১৯ বছরের এক ইতালিয়ান মেয়ে দ্বিতীয় জিজ্ঞাসায় জানতে চায় সেই অনিশ্চয়তার পরিবেশ সম্পর্কে; যা অনেক তরুণ-তরুণীকে অচল করে দেয় এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাঁধা সৃষ্টি করে! উত্তরে পোপ ১৪ লিও জোর বলেন, এই সিদ্ধান্তগুলো কোন কিছু বেছে নেওয়ার ব্যাপার নয়, কিন্তু কাউকে বেছে নেওয়ার বিষয়। যখন আমরা সিদ্ধান্ত নেই, তখন আমরা ঠিক করি ‘আমরা কী ধরণের মানুষ হতে চাই’। শেষ প্রশ্নটি করেছিল, ২০ বছর বয়সী আমেরিকান যুবক উইল। সে জিজ্ঞাসা করে, আমরা কীভাবে যিশুর সাথে সত্যিকার সাক্ষাৎ করতে পারি এবং কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি পরীক্ষা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি আমাদের সাথে আছেন? এর উত্তরে পুণ্যপিতা জোর দিয়ে বলেন, তোমাদের জীবনের পথ নিয়ে ভাবতে, ন্যায়বিচার খুঁজতে, দরিদ্রদের সেবা করে এবং পবিত্র সাক্রামেন্তে খ্রিস্টকে আরাধনা করে যিশুর সাক্ষাৎ পেতে পারো। এ যুব জুবিলী তীর্থে স্পেনের মারীয়া ও মিশরের পাস্কেল নামে দু’জন যুবতী মারা গেলে পুণ্যপিতা তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য প্রার্থনা করতে সকলকে আহ্বান করেন।
পুণ্যপিতা পোপ চতুর্দশ লিও যুব জুবিলী উৎসবে উপস্থিত যুবদেরকে আশা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে আহ্বান করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ও ইউক্রেনের যুবকদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে তাদেরকে বিশ্বে পরিবর্তন আনতে উৎসাহিত করেন।
এই যুব জুবিলীতে
অফিসিয়াল নিবন্ধন ৫ লাখের কিছু বেশি হলেও সমাপনী খ্রিস্টযাগে অংশগ্রহণকারী ছিল ১০ লক্ষ বিশ্বাসী মানুষ। এছাড়াও ৪৫০জন বিশপ ও ৭ হাজার যাজক এই বিশেষ খ্রিস্টযাগে উপস্থিত ছিলেন। ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এই জুবিলীতে পুণ্যদ্বার দিয়ে প্রবেশ করার সংখ্যা ৩০ লক্ষ। তারমধ্যে ৫ লক্ষ যুব জুবিলী উৎসবের যুবক-যুবতীরা।
৩ আগস্ট যুব জুবিলীর শেষ দিনে দূত সংবাদ প্রার্থনার পর পুণ্যপিতা ১৪ লিও প্রয়াত পুণ্যপিতা পোপ ফ্রান্সিসের ২ বছর আগে লিসবর্ণে দেওয়া ঘোষণা পুর্নব্যক্ত করে বলেন, আগস্ট ৩-৮, ২০২৭ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব যুব দিবসে দেখা হবে সিউল, কোরিয়াতে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে বিশপীয় যুব কমিশনের তত্ত্বাবধানে কমিশনের প্রেসিডেন্ট বিশপ সুব্রত বি, গমেজ ও সেক্রেটারী ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু’র নেতৃত্বে ২৮জনের একটি যুব দল যুব জুবিলী উৎসবে অংশগ্রহণ করে। এছাড়াও জিজাস ইয়ুদের কয়েকজন যুবকও এ বিশেষ জুবিলীতে অংশগ্রহণ করতে পারে।
লেখা ও ছবির মূল উৎস: ভাটিকান নিউজ অনুবাদক: ফাদার বুলবুল আগষ্টিন রিবেরু
